এআই খাতে বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বড় পতন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সংশয় এবং এ খাতে বড় কোম্পানিগুলোর বড় ব্যয়ের ঘোষণায় টালমাটাল হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক পুঁজিবাজার।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সংশয় এবং এ খাতে বড় কোম্পানিগুলোর বড় ব্যয়ের ঘোষণায় টালমাটাল হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক পুঁজিবাজার। গত সপ্তাহে মার্কিন শেয়ারবাজারে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারদরে বড় পতনের অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলসহ বিশ্বের প্রধান বাজারগুলোয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের নেতিবাচক কিছু পরিসংখ্যান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে গত নভেম্বরের পর বৈশ্বিক শেয়ার সূচক এখন সবচেয়ে খারাপ সপ্তাহ পার করছে। খবর রয়টার্স ও এপি।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি জায়ান্ট আমাজন, মাইক্রোসফট, গুগল ও মেটা এআই খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে চলতি বছর প্রায় ৬০ হাজার কোটি ডলার (৬০০ বিলিয়ন) ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে। এ বিপুল অংকের বিনিয়োগের বিপরীতে দ্রুত মুনাফা আসার সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে।

বৈশ্বিক শেয়ার সূচকে গত সপ্তাহে পতন হয়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। সিটি ইনডেক্সের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক ফিওনা সিনকোটা মনে করেন, এআই খাতের ব্যবসায়িক মডেল ও বিপুল বিনিয়োগ থেকে মুনাফা আসা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন চরম অনিশ্চয়তা কাজ করছে। বাজারের বর্তমান অস্থিরতায় তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে সফটওয়্যার ও ডেটা সার্ভিস খাতের শেয়ারদরে। গত ২৮ জানুয়ারির পর থেকে ওয়াল স্ট্রিটে এ খাতের কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধন প্রায় ১ লাখ কোটি বা ১ ট্রিলিয়ন ডলার কমেছে। বিনিয়োগকারীরা এ নজিরবিহীন পতনকে ‘সফটওয়্যার-মাগেডন’ হিসেবে অভিহিত করছেন। গত বৃহস্পতিবার একদিনেই এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সফটওয়্যার অ্যান্ড সার্ভিসেস ইনডেক্স ৪ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।

বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিএনপি পারিবাস ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা প্রশান্ত ভায়ানি বলেন, ‘বাজার এখন কেবল এআই প্রযুক্তি নিয়ে মেতে নেই; বরং এ খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা ঠিক কবে আসবে, বিনিয়োগকারীরা এখন সে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।’

প্রযুক্তি খাতের এ অস্থিরতার সঙ্গে যোগ হয়েছে মার্কিন শ্রমবাজারের নাজুক পরিস্থিতি। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা ১৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এছাড়া বেকারত্ব ভাতার জন্য আবেদনের সংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দেশটি বড় ধরনের মন্দার দিকে যাচ্ছে কিনা, বিনিয়োগকারীরা এখন তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে দেশটিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শ্রমবাজারের এ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশটির ঋণপত্র বা বন্ড মার্কেটেও। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নিরাপদ বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ায় ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড ৪ দশমিক ২৯ থেকে কমে ৪ দশমিক ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে।

ওয়াল স্ট্রিটের এ নিম্নমুখী প্রবণতা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শেয়ারবাজারে। জাপানের বাইরে এমএসসিআই এশিয়া-প্যাসিফিক সূচক দশমিক ৭ শতাংশ কমে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দরপতনের শিকার হয়েছে। সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। সিউলের প্রধান শেয়ার সূচক কসপি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে, যা বিশ্ববাজারের অন্যতম বড় পতন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ সময় প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কোম্পানি স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের শেয়ারদর ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। তবে জাপানি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকার কারণে টোকিও শেয়ারবাজারের নিক্কেই ২২৫ সূচক এদিন দশমিক ৮ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গুগলের মূল কোম্পানি অ্যালফাবেট প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মুনাফা করলেও এআই প্রযুক্তিতে খরচ দ্বিগুণ করার ঘোষণায় তাদের শেয়ারদর প্রাথমিকভাবে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছিল। অন্যদিকে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কোয়ালকমের আয়ের পূর্বাভাস বিনিয়োগকারীদের হতাশ করায় প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর ৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। ইউরোপের শেয়ারবাজারগুলোয়ও গত সপ্তাহে ছিল মিশ্র ও নেতিবাচক প্রবণতা। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ শেয়ার সূচক দশমিক ৯ এবং জার্মানির ডিএএক্স সূচক দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।

বাজার পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এআই খাতের কোম্পানিগুলোর অতিমূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ আয়ের অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক শেয়ার সূচকে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতির তথ্যে সন্তুষ্ট নন, বরং কোম্পানিগুলোর আর্থিক ভারসাম্য ও বাজার মূলধনের সামঞ্জস্য কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

আরও